পৃথিবীতে কোথাও কোনও পরিসরেই কেউ অপরাজেয় নয়। ফুটবলে চারবার বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির গত দুই বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতার পরে এবার ক্রিকেটে চারবার বিশ্বকাপ জয়ী ( ২বার সীমিত ওভারের বিশ্বকাপ ও ২ বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) ওয়েস্ট ইন্ডিজের আসন্ন ২০২৩-এর বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া সেই কথাকেই মনে করিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনকারী ম্যাচে ক্রমাগত খারাপ প্রদর্শনের জেরে তারা এবারের মতো ভারতে আয়োজিত হতে চলা ক্রিকেট বিশ্বকাপের মঞ্চে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হল। অন্যদিকে জিম্বাবোয়ে, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ডের মতো দলগুলি তুলনামূলক বেশ ভালো ফলাফল করেছে। সবশেষে নিয়মানুযায়ী শ্রীলঙ্কা ও নেদারল্যান্ড আগামী বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট ইতিহাস অনেক পুরনো। সালে কানাডার বিপক্ষে খেলার জন্য সর্বপ্রথম ক্রিকেট দল গঠন করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো দ্বীপদেশ শুধু ক্রিকেটের টানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নাম নিয়ে একত্রিত হয়েছে এক পতাকাতলে। ১৯২৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সদস্য হয় তারা। ১৯২৮ সালে প্রথম টেস্ট খেলার সুযোগ পায় । বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শুরুর দিনগুলোতে একচেটিয়া দাপট ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অবাক দৃষ্টিতে সবাই দেখেছে গ্যারি সোবার্স, ক্লাইভ লয়েড, গর্ডন গ্রিনিজ, জোয়েল গার্নার, ভিভ রিচার্ডস, কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোজ, ব্রায়ান লারাদের ক্রিকেট জাদু।
কিন্তু এখন সেসব কেবলই স্মৃতি। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে অষ্টম ও ওয়ানডেতে দশম স্থানই বলে দিচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতি। তবে ড্যারেন স্যামির নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দু'টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। সেই পরাক্রম এরপরে আর
দেখানো হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বোর্ডের দুর্নীতি, খেলোয়াড়দের সঙ্গে বোর্ডের প্রবল মনোবিরোধ, খেলোয়াড়দের অবসর ও হঠাৎ হঠাৎ চলে যাওয়া। সব মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন এক ধ্বংসস্তুপ।
গত একযুগ ধরে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো খেলেনি। ফলে তারা ধারাবাহিক ছিল। না। সেটাই তাদের জন্য ব্যুমেরাং হয়েছে। প্রসঙ্গত, '৭০ ও '৮০-এর দশকের সবথেকে শক্তিশালী দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে এটা লজ্জাজনক পারফরম্যান্স। তাদের সেরা সময় কাটিয়ে তারা এসেছেন। এবার বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনকারী রাউন্ডের সুপার সিক্সে সাই হোপরা কোনও পয়েন্ট পাননি। গ্রুপস্তরেও আশানুরূপ পারফর্ম করতে পারেননি। এমন হতশ্রী পারফরম্যান্সের পরে স্বভাবতই প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে যে, ক্যারিবিয়দের অতিরিক্ত টি-টোয়েন্টি খেলার প্রতি ঝোঁকই এমন দুর্দশার জন্য দায়ী নয় তো? সারা বিশ্বে আয়োজিত সমস্ত টি-টোয়েন্টি লিগেই তাদের খেলতে দেখা যায়। একসময় যে বিশ্বকাপ ছিল তাদের মালিকানায় আজ সেই ক্যারিবিয়দের এই দুর্দশা দুঃস্বপ্নই। নিয়তি আর কাকে বলে! একইসঙ্গে এই পরিণতি থেকে ভারতেরও ভাবা উচিত, অতিরিক্ত টি-টোয়েন্টি মানসিকতা নিয়ে খেলা ভারতীয় ক্রিকেটারদের আগামী দিনে এমন করুণ পরিস্থিতিতে ফেলবে না তো? বিগত বছরগুলোতে আইসিসি টুর্নামেন্টের মঞ্চে তাদেরও প্রদর্শন আশানুরূপ নয়। তাই এই বিষয়টি থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। ১৯৭৫-২০১৯ ক্রমাগত বিশ্বকাপ খেলা ওয়েস্ট ইন্ডিজের এবারে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা নিঃসন্দেহে এক অঘটন। সামগ্রিক ক্রিকেট বিশ্বের কাছে আগামী দিনের অশনিসংকেতও বলা যায়।
কলমে 🖋️ শুভজিৎ বসাক
সাউথ সিঁথি রোড, কল-৫০
(পুবের কলম)
