📰 “ডলার দিয়ে রুশ তেল কেনা”: ট্রাম্পের উপদেষ্টা নাভারোর নতুন ভারত-বিরোধী শুল্ক tirade
🔹 প্রেক্ষাপট
ভারত–মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক সবসময়ই উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো আবারও ভারতকে ঘিরে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। NDTV–র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাভারো অভিযোগ করেছেন যে ভারত আমেরিকান ডলারে রাশিয়া থেকে সস্তা ক্রুড অয়েল কিনে সেটিকে পরিশোধন করে আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপে রপ্তানি করছে, এবং এর ফলে রাশিয়ার যুদ্ধ–তহবিল (War Chest) আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের উপর ৫০% ট্যারিফ চাপানো একেবারেই যৌক্তিক, কারণ এটি একদিকে “unfair trade” এর জবাব, অন্যদিকে “national security” রক্ষার কৌশল।
🔹 নাভারোর অভিযোগ
নাভারো তাঁর বক্তব্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ তুলেছেন:
- ২০২২ সালের আগে ভারত রাশিয়া থেকে প্রায় ১%–এরও কম তেল আমদানি করত। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০%।
- বর্তমানে ভারত প্রতিদিন প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল রুশ ক্রুড অয়েল আমদানি করছে।
- ভারতীয় রিফাইনারিগুলো সস্তা দামে রুশ তেল কিনে সেটি রিফাইন করে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে, আর সেই অর্থের একটি বড় অংশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ তহবিলে যাচ্ছে।
- নাভারোর ভাষায়, “India has become a giant oil-refining hub and money-laundering machine for the Kremlin” অর্থাৎ ভারত এখন কার্যত রাশিয়ার জন্য একটি তেল পরিশোধন কেন্দ্র ও অর্থপাচারের মেশিনে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “The road to peace in Ukraine runs through New Delhi”, অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার পথ নাকি ভারতের উপরেই নির্ভর করছে। এ বক্তব্যের সঙ্গে তিনি সামাজিক মাধ্যমে এমন একটি ছবি পোস্ট করেছেন যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে গেরুয়া পোশাকে ধ্যানরত অবস্থায় দেখানো হয়েছে—এটিকে বর্ণবাদী ইঙ্গিতপূর্ণ বলেও সমালোচনা উঠেছে।
🔹 ভারতের অবস্থান
ভারত অবশ্য এসব অভিযোগের জবাবে বারবার স্পষ্ট করেছে যে,
- দেশীয় জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য এবং জনগণের জন্য কম দামে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনছে।
- এটি কোনোভাবেই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ নয়; বরং জি–৭ দেশগুলোর ঘোষিত $60–এর প্রাইস ক্যাপ–এর মধ্যেই এই ক্রয় হচ্ছে।
- ভারতীয় কূটনীতিকরা বরাবরই বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশের জন্য সস্তা জ্বালানি সংগ্রহ করা একটি কৌশলগত প্রয়োজন এবং এটি সম্পূর্ণভাবে ন্যায্য পদক্ষেপ।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে সস্তা দামে তেল কেনা শুধুমাত্র ভারতের অর্থনীতিকেই নয়, বরং বিশ্ববাজারকেও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে। কারণ, যদি ভারত এত পরিমাণ তেল আমদানি না করত, তাহলে বৈশ্বিক দামে আরও অস্থিরতা তৈরি হতো।

🔹 যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
অন্যদিকে, মার্কিন পক্ষ বলছে—
- ভারতীয় কোম্পানিগুলো এই সস্তা তেল কিনে রিফাইন করে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় রপ্তানি করছে, আর সেই লাভ সরাসরি পুতিনের যুদ্ধ চালানোর তহবিলে ঢুকছে।
- নাভারো আরও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে, তখন ভারত নাকি রাশিয়াকে অর্থ জোগাচ্ছে।
- তাঁর মতে, এভাবে ভারতীয় তেল ব্যবসায়ীরা “বিপুল মুনাফা” করছে, কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ভারত শুধু তেল নয়, রাশিয়া থেকে অস্ত্রও কিনছে, এবং একই সময়ে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দাবি করছে। নাভারোর চোখে এটি “Strategic freeloading” অর্থাৎ কৌশলগতভাবে বিনামূল্যে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা।
🔹 কেন ৫০% শুল্ক?
নাভারো তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে এই ৫০% শুল্কের মধ্যে—
- ২৫% হচ্ছে অন্যায্য বাণিজ্যের শাস্তি (Unfair Trade Penalty)
- ২৫% হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার শুল্ক (National Security Tariff)
এভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
🔹 আন্তর্জাতিক তাৎপর্য
এই ঘটনাটির গুরুত্ব অনেক বেশি।
- প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে ভারত–মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে চাপের মধ্যে পড়ছে।
- দ্বিতীয়ত, এটি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে এনার্জি সিকিউরিটি (জ্বালানি নিরাপত্তা) এবং জিওপলিটিক্স (ভূরাজনীতি) একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
- তৃতীয়ত, ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রিফাইনিং হাব, ফলে এর সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাজারকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
- চতুর্থত, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি যে কতটা জটিল আকার ধারণ করেছে, এই বিতর্ক তার একটি বড় প্রমাণ।
🔹 উপসংহার
ভারত একদিকে নিজস্ব জনগণের জন্য সস্তা জ্বালানি নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই পদক্ষেপকে বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প শিবির আবারও ভারতের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, আর এই চাপ ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
📌 বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে NDTV World News–এর তথ্যের ভিত্তিতে এবং NDTV–কেই এখানে Trusted Source হিসেবে উল্লেখ করা হলো। (প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৫, 11:18 am IST)
©পড়াশুনো (PoraShuno)