|
Getting your Trinity Audio player ready...
|


ভারত বনাম আমেরিকা: সন্তান মানুষ করার ৬টি অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এক আমেরিকান মা
“একজন মা হিসেবে আমি…”
প্রায় আট বছর আগে প্রথমবার ভারতে পা রেখেছিলেন আমেরিকান নারী Kristen Fischer। তখন তিনি ভাবতেও পারেননি, এই দেশ একদিন তাঁর জীবনের এত বড় অংশ হয়ে উঠবে। আমেরিকায় ফিরে গেলেও ভারতের প্রতি টান কখনও কমেনি। পরে বিয়ে, দুই কন্যাসন্তানের মা হওয়া—সবকিছুর পরেও সেই টান থেকেই যায়। শেষমেশ তিনি ও তাঁর স্বামী সিদ্ধান্ত নেন, পরিবার নিয়ে আবার ভারতে ফিরে এসে এখানেই সন্তান মানুষ করবেন।
ভারতে কয়েক বছর বসবাস করার অভিজ্ঞতা থেকে ক্রিস্টেন ফিশার প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারত ও আমেরিকার প্যারেন্টিং স্টাইলের পার্থক্য নিয়ে মজার ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। সম্প্রতি তাঁর একটি ইনস্টাগ্রাম রিল ভাইরাল হয়েছে, যেখানে শিশুদের ঘুম, খাওয়া, শাসন—এসব দৈনন্দিন বিষয়ে দুই দেশের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি কোথাও বলেননি কোনটা ভালো বা খারাপ; বরং দেখিয়েছেন, সংস্কৃতি কীভাবে সন্তান মানুষ করার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে।
নিচে তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে ভারত ও আমেরিকার প্যারেন্টিংয়ের ৬টি বড় পার্থক্য তুলে ধরা হলো—

১. শিশুর ঘুমের জায়গা: স্বাধীনতা বনাম ঘনিষ্ঠতা
আমেরিকায় সাধারণত শিশুকে আলাদা ক্রিবে একা ঘুম পাড়ানো হয়। এতে ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্পেস শেখানো হয়।
ভারতে কিন্তু বিষয়টা আলাদা। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মায়ের সঙ্গেই শিশু ঘুমায়, কখনও কখনও বড় হওয়া পর্যন্ত। এটাকে দুর্বলতা নয়, বরং আবেগী বন্ধন ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
👉 একদিকে ছোট থেকেই স্বাধীনতা, অন্যদিকে কাছাকাছি থেকে বড় হওয়া—দুটোই আলাদা দর্শন।

২. কোলে নেওয়া শিশুর ধরন
আমেরিকায় আধুনিক, আরামদায়ক বেবি ক্যারিয়ারে শিশুকে বহন করা হয়।
ভারতে বহু প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত কাপড়ের স্লিং বা আঁচলের মতো পদ্ধতিতে শিশুকে কোলে নেওয়া হয়।
👉 উদ্দেশ্য এক—শিশুকে কাছে রাখা, কিন্তু পদ্ধতিতে প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট।
৩. খাওয়ানোর অভ্যাস: স্বনির্ভরতা বনাম স্নেহ
আমেরিকায় ছোটবেলা থেকেই শিশুকে নিজে নিজে খেতে উৎসাহ দেওয়া হয়, নোংরা হলেও তা শেখার অংশ।
ভারতে বাবা-মা অনেকদিন পর্যন্ত নিজের হাতে সন্তানকে খাওয়ান। এটা শুধু খাবার দেওয়া নয়, বরং ভালোবাসা ও যত্নের প্রকাশ।
👉 দুটোতেই অতিরঞ্জন নেই, শুধু আবেগের প্রকাশ আলাদা।

৪. শোবার সময়: রুটিন বনাম জীবনের ছন্দ
আমেরিকায় সাধারণত সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই শিশুদের শোবার সময়। নির্দিষ্ট রুটিন, সবকিছু পরিকল্পিত।
ভারতে পরিবারগুলো প্রায়ই রাত ১১টার দিকে ঘুমাতে যায়। সন্ধ্যার আড্ডা, পারিবারিক সময়—সব মিলিয়ে শিশুরাও সেই ছন্দে বড় হয়।
👉 এখানে ব্যক্তিগত রুটিনের চেয়ে পারিবারিক সময় বেশি গুরুত্ব পায়।
৫. রাগ বা কান্না সামলানো
আমেরিকায় শিশুর ট্যান্ট্রাম হলে অনেক সময় কড়া শাসন বা ‘টাইম-আউট’-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ভারতে আবার অনেক সময় আদর, মন ভোলানো বা চকোলেট দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো হয়।
👉 হাস্যরসের মধ্যেই বোঝা যায়, শাসনের ধরন সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল।
৬. দুধেও সংস্কৃতির ছোঁয়া

আমেরিকায় শিশুরা সাধারণত ঠান্ডা, সাদামাটা দুধ খায়।
ভারতে দুধ মানেই গরম, কখনও চিনি বা চকলেট মিশিয়ে—একটা আরামের অনুভূতি। অনেক পরিবারের কাছে এটা রাতের একটা প্রিয় রীতি।
👉 ছোট্ট এই বিষয়টিও স্মৃতি ও আবেগ তৈরি করে।
কেন এই ভিডিও এত মানুষের মন ছুঁয়েছে?
এই রিলের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভারসাম্য। এখানে কোনও সংস্কৃতিকে ছোট করা হয়নি, আবার অযথা মহিমান্বিতও করা হয়নি। বরং দেখানো হয়েছে—প্যারেন্টিং মানে ‘ঠিক’ বা ‘ভুল’ নয়, বরং পরিস্থিতি, সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধ বোঝা।
আজকের দিনে বহু পরিবার একাধিক সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করছে। তাই স্বাধীনতা বনাম ঘনিষ্ঠতা, শাসন বনাম সান্ত্বনা, রুটিন বনাম নমনীয়তা—এই দ্বন্দ্বগুলো সবার কাছেই পরিচিত।
শেষ পর্যন্ত, শিশুটি ক্রিবে একা ঘুমোক বা বাবা-মায়ের পাশে, ঠান্ডা দুধ খাক বা গরম চকলেট দুধ—সব সংস্কৃতির লক্ষ্য একটাই: এমন সন্তান গড়ে তোলা, যে নিজেকে নিরাপদ, ভালোবাসায় ভরা এবং নিজের ঘরের মতো অনুভব করে।