🌺 নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু: এক অগ্নিপুরুষের জীবন, সংগ্রাম ও অমীমাংসিত রহস্য 🌺
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে, যাঁর ডাক আজও মানুষকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে—তিনি হলেন , যিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় নেতাজি নামে। ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি ওড়িশার কটকে জন্ম নেওয়া এই মহাপুরুষ শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, তিনি ছিলেন এক দুর্দমনীয় বিপ্লবী চেতনার প্রতীক।
👶 শৈশব ও শিক্ষাজীবন: গড়ে ওঠার শুরু
নেতাজির পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা ও কঠোর নীতিবোধসম্পন্ন নারী। শৈশব থেকেই সুভাষচন্দ্র ছিলেন অসম্ভব মেধাবী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন এক ইংরেজ অধ্যাপক ভারতীয়দের অপমান করলে প্রতিবাদ করায় তিনি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন—এই ঘটনাই প্রমাণ করে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব তাঁর রক্তে ছিল।
পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করে দেশের সেবা করা সম্ভব নয়—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সেই সম্মানজনক চাকরি ত্যাগ করেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

✊ জাতীয় আন্দোলনে প্রবেশ ও মতাদর্শের সংঘর্ষ
ভারতে ফিরে এসে নেতাজি যোগ দেন জাতীয় কংগ্রেসে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দ্রুতই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের পথ তাঁর কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন—ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভাঙতে হলে সশস্ত্র সংগ্রাম অপরিহার্য।
এই মতপার্থক্যের কারণে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ চরমে ওঠে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলেও অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। এখান থেকেই তাঁর বিপ্লবী পথচলার নতুন অধ্যায় শুরু।
🌍 দেশত্যাগ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের উত্থান
ব্রিটিশ নজরদারির মধ্যে থেকেও এক দুঃসাহসিক অভিযানে তিনি ভারত ছেড়ে জার্মানি পৌঁছান, পরে জাপানের সহায়তায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army – INA)।
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—এই ডাকেই হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক তাঁর নেতৃত্বে একত্রিত হন।
আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করেন ‘শহীদ’ ও ‘স্বরাজ’। যদিও সামরিকভাবে এই অভিযান সফল হয়নি, কিন্তু ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতার আগুন এমনভাবে জ্বেলে দেয়, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
❓ শেষ অধ্যায়: রহস্যময় মৃত্যু না কি অন্তর্ধান?
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে তাইওয়ানে এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে—এমনটাই সরকারি দাবি। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ আজও নেই। তাঁর দেহাবশেষ, ডিএনএ পরীক্ষা, সাক্ষীদের বক্তব্য—সবকিছুতেই রয়েছে অসংখ্য অসঙ্গতি।
বহু তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে—শাহনওয়াজ কমিটি, খোসলা কমিশন, মুখার্জি কমিশন—কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তই সর্বসম্মত নয়। অনেকের বিশ্বাস, নেতাজি জীবিত ছিলেন বহু বছর, কেউ বলেন তিনি রাশিয়ায় ছিলেন, কেউ বলেন তিনি সন্ন্যাসী রূপে ভারতে ফিরেছিলেন। এই রহস্য আজও অমীমাংসিত।

🔥 উত্তরাধিকার ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা
নেতাজি শুধু একটি নাম নন—তিনি এক চেতনা। আত্মসম্মান, সাহস, ত্যাগ আর নিঃশর্ত দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক। আজও তাঁর আদর্শ তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে।
নেতাজি আমাদের শিখিয়েছেন—
👉 স্বাধীনতা ভিক্ষায় মেলে না
👉 আত্মত্যাগ ছাড়া মুক্তি আসে না
👉 দেশ সবার আগে
🌸 জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু মাল্যদান করেই থামতে পারি না। তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা। যতদিন ভারত থাকবে, ততদিন নেতাজি থাকবেন—অগ্নিশিখার মতো, প্রেরণার মতো, প্রশ্নের মতো।
জয় হিন্দ 🇮🇳